শ্রীপান্থের লেখা বিখ্যাত 'ঠগী' বইয়ের আলোচনা- কনক চন্দ্র রায়

শ্রীপান্থ - 'ঠগী'

১৮৫০ খ্রি. পর্যন্ত তার আগের ৩০০ বছর প্রতিবছর গড়ে ৪০ হাজার মানুষ হারিয়ে যাচ্ছিল। যারা হারিয়ে যাচ্ছিল তাদের কেউবা তীর্থযাত্রী, কেউবা বণিক, কেউবা সওদাগর, কেউবা কোম্পানির ফৌজ। যেকোনো উদ্দেশ্যে কেউ পথে বের হলে পথ না হারিয়ে নিখোঁজ হওয়ার শঙ্কা থেকেই যায়। কি হচ্ছিল তাদের?


একদল সুস্থ-স্বাভাবিক বিশ্বাসী মানুষের দল, যে হতে পারে মুসলিম আবার হতে পারে হিন্দু কিন্তু যখন সে শিকারের উদ্দেশ্যে পথে বের হয় তখন সে মা ভবানীর সন্তান। প্রতিটি যাত্রার পূর্বে তাকে পালন করতে হয় নির্দিষ্ট কিছু আচার, পাখির ডাকের দ্বারা যে স্থির করে শুভ-অশুভ এবং মেনে চলে তা নিষ্ঠার সাথে। সরলতার কৌশলে যারা কাছাকাছি আসে পথিকের। পথিককে মুগ্ধ করে গান শুনিয়ে, গল্প শুনিয়ে তারপর সুযোগ বুঝে তাদের হলুদ রুমালে ফাঁস দিয়ে হত্যা করে। এরাই হল ঠগী। 


কোন পথিক দলের সদস্য ১০, ১৫, ২০, ২৫, ৩০ বা আরও বেশি হতে পারে কিন্তু যদি তারা কোন ঠগী দলের লক্ষ্যে পরিণত হয় তবে তাদের বেঁচে গন্তব্যে ফেরা প্রায় অসম্ভব। না, এটা কোন কল্প কাহিনী নয় এটাই ছিল সে সময়ের সত্যি এখন তা ইতিহাস।


কি হলো ঠগীদের? তারা কি পরিবর্তিত হয়ে গেল? হ্যাঁ, তাদের কেউ বা ভালো হয়ে গেল, কাউকে ফাঁসি দেওয়া হল, কাউকে বা করা হলো দ্বীপান্তর।


কাজটি ছিল খুবই কঠিন, দুঃসাধ্য ও প্রায় অসম্ভব। এই অসম্ভব-প্রায় কাজটিকে সম্ভব করেছিলেন উইলিয়াম হেনরী স্লীম্যান। যিনি ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় আসেন এবং শিক্ষানবিশ অবস্থায় ফরাসি পর্যটক এম. থিভেনট এর ভ্রমণ কাহিনীতে ঠগীদের সম্পর্কে জানতে পারেন। এরপর যেখানেই গিয়েছেন, সেখানেই এই বিষয়ে মানুষকে জিজ্ঞেস করেছেন কিন্তু আশ্চর্য কেউ কিছু জানে না। তাহলে কি ঠগীরা আর নেই? হাল ছাড়েন নি স্লীম্যান। তার অসম্ভব শ্রম, মেধা আর নিষ্ঠা ঠগী কেন্দ্রিক হওয়ায় তিনি হয়ে ওঠেন ঠগী স্লীম্যান। তিনি ঠগীদের শুধু নির্মূল নয় বরং তাদের পুনর্বাসিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।


বইটি কেউ পড়া শুরু করলে এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তার যাত্রা শুরু হবে এবং ধারাবাহিকভাবে একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শেষ হবে। আমি বইটি পড়ে ঠগীদের সম্পর্কে যেমন জেনেছি, তেমনি অবাক, মুগ্ধ ও অনুপ্রাণিত হয়েছি স্লীম্যানের নিবেদিতপ্রাণ কর্মতৎপরতায়।


আলোচক: কনক চন্দ্র রায় (উপজেলা কৃষি অফিসার, চিলমারী, কুড়িগ্রাম)

কোন মন্তব্য নেই

মার্জিত মন্তব্য প্রত্যাশিত